দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

যৌন অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক বিশেষ ওষুধ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাজারো পুরুষ কারাবন্দীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণায় যুক্ত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেলিন্ডা উইন্ডার জানিয়েছেন, বর্তমানে কারাগারে থাকা যৌন অপরাধে দণ্ডিতদের প্রতি চারজনের একজনকে এ চিকিৎসার জন্য বিবেচনা করা হতে পারে। সংখ্যায় যা প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ জন।
যৌন আকাঙ্ক্ষা দমনকারী ওষুধের ব্যবহার সম্প্রসারণে আগ্রহী অ্যান্ডি বার্নহামের প্রশাসন। কারাগারে ধারণক্ষমতার সংকট নিরসনের প্রচেষ্টার মধ্যেই স্বেচ্ছাভিত্তিক এ চিকিৎসা কর্মসূচি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের বিভিন্ন সূত্র দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছে।
তবে ধর্ষণ ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধে জড়িতদের মতো গুরুতর যৌন অপরাধীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে এ ধরনের চিকিৎসা চালুর বিষয়ে শাবানা মাহমুদের আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে কি না, তা পুনর্বিবেচনা করছেন মন্ত্রীরা।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগারগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার ব্যক্তি যৌন অপরাধে সাজা ভোগ করছেন। অন্যদিকে, প্রতি মাসে ৮৫০ জনের বেশি পুরুষকে অনলাইনে শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।
সমস্যাজনক যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে ওষুধ প্রয়োগের বর্তমান পরীক্ষামূলক কর্মসূচি নভেম্বর মাসে ১০টি থেকে বাড়িয়ে ২০টি কারাগারে সম্প্রসারণ করা হবে। পরবর্তী ধাপে দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের বাইরে উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আরও দুটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা অঞ্চলে কর্মসূচিটি চালু করা হবে।
যাদের মনে অনাকাঙ্ক্ষিত, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র যৌন চিন্তা, অব্যাহত যৌন উত্তেজনা এবং অস্বাস্থ্যকর যৌন তাড়না ও আচরণ রয়েছে, তাদের লক্ষ্য করেই এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। পরীক্ষামূলক এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কারাবন্দীদের বেছে নেওয়া ক্ষেত্রে কিছু ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এমন ওষুধ রয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন চিন্তা কমাতে সহায়তা করে। আবার কিছু ওষুধ পুরুষ হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ওষুধে পুরুষ হরমোনের মাত্রা বয়ঃসন্ধির আগের পর্যায়ে নেমে যেতে পারে।
অধ্যাপক বেলিন্ডা উইন্ডার বলেন, পরীক্ষামূলক কর্মসূচির অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে আগামী ২৮ মাসের মধ্যে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগার ও প্রবেশন সেবায় এ ওষুধ প্রয়োগের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী ফলাফল কার্যকর মনে হলে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরে কর্মসূচিটি ব্যাপকভাবে চালু করার জন্য তারা প্রস্তুত থাকতে পারে।’
উইন্ডার বলেন, এ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি নতুন করে অপরাধ না করার অঙ্গীকারে চিকিৎসাসহায়তা দিতে হবে। তার ভাষায়, ‘যথাযথ অর্থায়নে স্বেচ্ছাভিত্তিক একটি জাতীয় কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত গড়ে তোলা সম্ভব বলে আমি আশাবাদী। ভালো একটি জাতীয় সেবার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, স্পষ্টভাবে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা এবং ওষুধের পাশাপাশি উপযুক্ত মানসিক সহায়তা প্রয়োজন।’
গত বছর তৎকালীন বিচারমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ সংসদ সদস্যদের জানিয়েছিলেন, যৌন অপরাধীদের জন্য স্বেচ্ছাভিত্তিকভাবে এ চিকিৎসা দেশব্যাপী চালুর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন। পাশাপাশি এটি বাধ্যতামূলক করা সম্ভব কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে দ্য গার্ডিয়ানকে দুই বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, বাধ্যতামূলকভাবে এ পরিকল্পনা কার্যকর হবে না। যৌন অপরাধীদের নিয়ে এক ধরনের বিষণ্নতার ওষুধের পরীক্ষামূলক গবেষণার সহপ্রধান তদন্তকারী উইন্ডার বলেন, বাধ্যতামূলক পদ্ধতি নিয়ে তার গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাধ্যতামূলক পদ্ধতি চালু করতে হলে কারাগারে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করে তাদের মধ্য থেকে সেই তুলনামূলক ছোট গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে, যাদের জন্য এ চিকিৎসা প্রকৃতপক্ষে উপযুক্ত হতে পারে। এতে চিকিৎসা ও সম্পদের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।’
তার মতে, চিকিৎসা বাধ্যতামূলক করা হলে অপরাধীদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং এর অপব্যবহারের সুযোগও তৈরি হতে পারে।
উইন্ডার বলেন, ‘যারা প্রতিদিন ওষুধ নিতে চান না, তাদের ওপর তা চাপিয়ে দেওয়া এবং তদারক করা অত্যন্ত অদক্ষ ও অকার্যকর হতে পারে। এতে আস্থা, তথ্য প্রকাশ, চিকিৎসায় অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসাগত সম্পর্কের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে বিষয়ে এমন অনেক পরিণতি দেখা দিতে পারে, যা আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।’
এ ওষুধকে ‘রাসায়নিক খোজাকরণ’ হিসেবে বর্ণনা করাও প্রত্যাখ্যান করেন উইন্ডার। তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ যৌন অপরাধীদের খোজা করার ধারণাটি পছন্দ করেন বলেই এমনটি বলা হয়। কিন্তু এসব ওষুধ স্থায়ী নয়, খোজাকরণের মতোও নয়। কার্যকর থাকতে হলে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়।’
চলতি মাসের শুরুতে অ্যান্ডি বার্নহাম ঘোষণা দেন, ধর্ষণ, যৌন ফাঁদে ফেলা এবং শিশুদের বিরুদ্ধে গুরুতর যৌন অপরাধে দণ্ডিত কারাবন্দীরা অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া আগাম মুক্তি কর্মসূচির আওতায় থাকবেন না। তবে চার বছরের কম মেয়াদের সাজাপ্রাপ্ত অন্য যৌন অপরাধীরা আগাম মুক্তির সুযোগ পাবেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য অপরাধী গোষ্ঠীর তুলনায় যৌন অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার তুলনামূলক কম। ২০২৩ সালে যৌন অপরাধীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পুনরায় অপরাধে জড়িয়েছিলেন। একই সময়ে চুরিকে প্রধান অপরাধ হিসেবে সাজাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৫৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
তবে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচিটি চালুর আগে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন কারাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। সমালোচকেরা আগে থেকেই বলে আসছেন, দীর্ঘ সময় পুরুষ হরমোনের মাত্রা দমন করা হলে হাড়ক্ষয় ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত এলোমেলো নিয়ন্ত্রিত গবেষণা না থাকায় তথ্যও সীমিত।
কারা সংস্কারবিষয়ক সংগঠন হাওয়ার্ড লিগ ফর পেনাল রিফর্মের প্রচারবিষয়ক পরিচালক অ্যান্ড্রু নিলসন বলেন, ‘কারাগারভিত্তিক এ ধরনের চিকিৎসা কর্মসূচির ইতিহাস নানা জটিলতায় ভরা। তাই বিকল্প পদ্ধতি অনুসন্ধানের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি নতুন পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের আগে সতর্ক থাকারও কারণ আছে। এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, কাউকে যেন এসব রাসায়নিক চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা না হয় এবং অংশগ্রহণ সত্যিকার অর্থেই স্বেচ্ছাভিত্তিক হয়।’
কারা কর্মকর্তাদের সংগঠনের জাতীয় চেয়ারম্যান মার্ক ফেয়ারহার্স্ট বলেন, ‘জনসাধারণের সুরক্ষায় সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে—এমন যেকোনো উদ্যোগই স্বাগত। তবে এর সফলতা প্রমাণ করে এমন তথ্য হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কর্মসূচিটি সম্প্রসারণের বিষয়ে আমি সতর্ক থাকব।’
বিচার মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এই সরকার যৌন অপরাধের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কারণেই বিদ্যমান পরীক্ষামূলক কর্মসূচি আরও দুটি অঞ্চলে সম্প্রসারণে আমরা দ্রুত কাজ করছি।’
/অ